কড়া সমালোচনা আর একটা "ভালো মেয়ে" হওয়ার চড়া মূল্য

দ্য পেরেন্টিং প্লেবুক — পার্ট ৩: অন্ধ আনুগত্য, অবিরাম সমালোচনা আর গ্রহণযোগ্য হওয়ার চাপ আমাকে কী শিখিয়েছিল, এবং আমি আমার সন্তানকে কী অন্যভাবে শেখাতে চাই।

দ্য পেরেন্টিং প্লেবুক — পার্ট ৩

কনটেন্ট নোট: ছোটবেলার অপমান, বডি-শেইমিং, ক্ষতিকর সম্পর্ক এবং শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে একটি অবমাননাকর শব্দ (ableist slur)।

পাশাপাশি দুই দৃশ্য: বাঁয়ে কোঁকড়ানো চুলের একটি শিশু চিৎকার করে কাঁদছে, ডানে গোলাপি ফুলের পোশাক পরা একটি শিশু শান্ত হয়ে আছে।

আমার ভুলগুলোর সাথে আফসোসগুলোর একটা তফাত আছে।

আমি কিছু ভুল করেছি কারণ আমি কোনো কিছু চেয়েছিলাম, কোনো কিছু ভুল বুঝেছিলাম বা এমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যার ফল খারাপ হয়েছিল। সেগুলোর দায় আমারই। কিন্তু আমার সবচেয়ে বেশি আফসোস লাগে এমন সব জিনিস নিয়ে, যেগুলো হয়েছে আমার আশপাশের বড়রা যেভাবে আমাকে দেখতে চেয়েছিল, সেই ছাঁচে নিজেকে ফেলতে গিয়ে। জিনিসগুলো হয়তো আমার নিজের চাওয়াই ছিল না; আমি শুধু সবার কাছে “গ্রহণযোগ্য” হতে চেয়েছিলাম।

এই সিরিজটা শুরু হয়েছিল একটা প্রশ্ন দিয়ে: ভালো আচরণ করা মানেই কি একটা বাচ্চা ভালো আছে? পার্ট ২-এ আমি আমার ছেলের সাথে কাটানো একটা কঠিন সকালের কথা বলেছিলাম আর অথরিটেটিভ পেরেন্টিং নিয়ে আলোচনা করেছিলাম—কীভাবে কোনো প্রত্যাশা বাদ না দিয়েও কথা শুনা যায়, আর সবকিছুকে যুদ্ধক্ষেত্র না বানিয়ে কীভাবে গাইড করা যায়।

আর এবার আমি তাকাচ্ছি সেটারই অন্য দিকে। বাচ্চা হিসেবে আমার নিজের কেমন লেগেছিল? বড়রা যখন আমাকে আচরণ শেখাতে ব্যস্ত ছিল, আর আমি আসলে কী শিখেছিলাম?

কারণ আমি অনেক কিছুই শিখেছিলাম। যদিও তারা যা শেখাতে চেয়েছিল, ঠিক শিখিনি।

অথরিটেরিয়ান পেরেন্টিংয়ে বাচ্চার দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে অনুগত থাকা এবং নিয়ন্ত্রণের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। অন্যদিকে অথরিটেটিভ পেরেন্টিংয়ে স্পষ্ট প্রত্যাশার পাশাপাশি ভালোবাসা, বুঝিয়ে বলা এবং সাপোর্ট থাকে। দুটোর ক্ষেত্রেই নিয়ম থাকতে পারে। তবে তফাতটা হলো সেই নিয়মগুলোর বেলায় সম্পর্কটা কেমন আচরণ করছে: বাচ্চার দৃষ্টিভঙ্গিটা বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে, নাকি সেটাকে নিয়ম মানার পথে একটা বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আমার কাছে এটাই হলো “আমি তোমাকে গাইড করার জন্য দায়ী” আর “আমার হুকুমই শেষ কথা”—এই দুটোর আসল পার্থক্য।

কোনো কড়া নির্দেশ মানেই যে সেটা অথরিটেরিয়ান পেরেন্টিং, তা কিন্তু নয়। আমি এ কথা বলছি না যে বাচ্চাকে রাস্তায় দৌড়ে যাওয়া থেকে আটকাতে গেলে কোনো বিশাল মিটিং বসাতে হবে। আসল প্রশ্নটা হলো পুরো সম্পর্কের ধরণ নিয়ে: বাচ্চার কি প্রশ্ন করার, বুঝিয়ে বলার, ভুল করার এবং নিজের কথা শোনার মতো সুযোগ আছে? আমরা এখানে একটা দীর্ঘমেয়াদী ধারা নিয়ে কথা বলছি, কেবল একটা বিরক্তিকর সকাল দিয়ে পুরো পরিবারকে বিচার করছি না।

আমার বাবা-মা কোনো একটা নির্দিষ্ট বই বা রেসিপি মেনে চলেননি। তাদের পদ্ধতিটাও কোনো একটা খোপে সুন্দর করে মিলে যায়নি। তবে একটা জিনিস পরিষ্কার—তারা নিজেরা সব দায়িত্ব নিয়ে আমাদের জন্য সবকিছু করে দেননি। তারা আমাদের কাছ থেকে অন্ধ আনুগত্য চেয়েছেন, আর বারবার আমাদের এই অনুভূতি দিয়েছেন যে আমরা যথেষ্ট না।

আমরা কীভাবে একটা ডিম ভাঙছি, কীভাবে সবজি রান্না করছি, তাদের কাপড় আয়রন করছি বা মেঝে পরিষ্কার করছি —সেগুলা প্রতিটাই ভুল ছিল। মনে রাখবেন, আমি যখন এই কাজগুলো করতাম, তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ছয় থেকে নয় বছরের মধ্যে। সব সময় ভুল ধরা আর দরকারি গাইডেন্স দেয়া—দুটো এক জিনিস নয়।

বড় হওয়ার সময় আমি বিশ্বাস করতাম যে আমি সব কিছুই ভুল করি। আমি খুব জোরে হাসতাম, খুব বেশি খোলাখুলি নাচতাম, জোরে গান গাইতাম, বেশি দৌড়াতাম, আমার হাঁটার ধরন আর কথা বলার ভঙ্গিও নাকি অদ্ভুত ছিল, আমি গসিপ করতাম, কোনো গোপন কথা পেটে রাখতে পারতাম না। আমার বুক বড় ছিল। দেখতে বড় মানুষের মতো লাগতাম, অথচ আবার খুব রাফ, লম্বাটে আর যথেষ্ট মেয়েসুলভও ছিলাম না! এমনকি আমার হাসির শব্দটা পর্যন্ত এই বলে আলোচনা করা হতো যে এটা শুনলে কোনো ছেলে আকৃষ্ট হবে না, ভবিষ্যতে জামাই পাবো না —আর এই কথাগুলো আসত আমার খোদ মায়ের মুখ থেকে! আমার শরীরটা নাকি যথেষ্ট মেয়েসুলভ, কিন্তু আমার আচরণ ততটা মেয়েসুলভ নয়। চমৎকার! একটা বাচ্চার জন্য এর চেয়ে পরিষ্কার নির্দেশ আর কী হতে পারে!

আমি একটা জিনিসই বুঝতে পারছিলাম : আমাকে আমার উপস্থিতি কমিয়ে আনতে হবে। তাই আমি আমার হাঁটার ভঙ্গি ঠিক করার চেষ্টা করলাম, গলা নামিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলাম, আর নিজের প্রতিক্রিয়াগুলো সামলাতে লাগলাম। আমি পরিপাটি দেখতে চেয়েছিলাম, চুলগুলো সুন্দর করে বাঁধা থাকত—তবে এত সুন্দর করে নয় যে সেটা কারো নজর কাড়বে। ঠিক ততটুকুই, যতটা একটা “ভালো মেয়ে” দেখতে হয়। ভালো মেয়ে। কে জানে সেটা দেখতে আসলে কেমন হওয়া উচিত! আমি চেষ্টা চালাতে থাকলাম।

এর সাথে সম্পর্কিত আরেকটা টার্ম আছে যা এই পুরো বিষয়টার আরেকটা অংশ বুঝতে আমাকে সাহায্য করে: সাইকোলজিক্যাল কন্ট্রোল বা মানসিক নিয়ন্ত্রণ। গবেষকরা এই শব্দটা ব্যবহার করেন এমন সব অভিভাবকত্ব বোঝাতে যেখানে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করা হয় বা আবেগ নিয়ে কারচুপি করা হয়—যেমন অপরাধবোধ তৈরি করা, লজ্জা দেওয়া, ব্যক্তিগত আক্রমণ করা এবং বাচ্চার অনুভূতিকে মূল্য না দেওয়া। এটা বাচ্চার আচরণ কেমন হওয়া উচিত সেই প্রত্যাশা তৈরির চেয়ে একদম আলাদা।

“একটু আস্তে কথা বলো, কেউ ঘুমাচ্ছে”—এই কথাটা আমাকে আমার কাজটা বদলানোর একটা কারণ দেয়। কিন্তু আমি যেভাবে হাসি সেটা নিয়ে মশকরা করা মানে হলো আমার নিজের ভেতরের সত্তা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দেওয়া।

আমি বলছি না যে সব কঠোর পরিবার আমার পরিবারের মতো। আমি কেবল খতিয়ে দেখতে চাচ্ছি তখন কী ঘটেছিল যখন নিয়ম মানার দাবির সাথে অবিরাম সমালোচনা আর বডি-শেইমিং মিলে একাকার হয়ে গিয়েছিল। আমার জীবনে এই জিনিসগুলো এমনভাবে পেঁচিয়ে ছিল যে কোনো একটা নির্দিষ্ট পেরেন্টিং লেবেল দিয়ে বোঝানো সম্ভব না।

আমার মনে আছে আমি একটা হাসিখুশি বাচ্চা ছিলাম, লাফালাফি করতে ভালোবাসতাম। এরপর আমাকে বলা হলো যে আমার শরীর পরিবর্তন হচ্ছে, তাই এভাবে লাফালাফি করাটা অভদ্র দেখায়। আমার বয়স তখন মাত্র ছয় কি আট বছর! নিজের শরীরে সাবলীলভাবে চলাফেরা করার স্বাধীনতা পাওয়ার বদলে আমি সবসময় সচেতন হয়ে উঠলাম যে বড় কোনো পুরুষের চোখে আমার শরীরটা কেমন দেখাচ্ছে। ত্রিশ বছর পরও যখন আমি লাফাই, তখন অবচেতনভাবেই শরীর ঢেকে রাখি—কারণ আমার ভেতরের একটা অংশ এখনো সেই নির্দেশটাই মেনে চলছে। পাশে সেই বড় মানুষটার আর দাঁড়িয়ে থাকার দরকার নেই। তারা কী বলেছিল, আমার আজও মনে আছে।

আমার হাসির ক্ষেত্রেও একই জিনিস হয়েছিল। আমি আগে হা করে, সব দাঁত বের করে হাসতাম। কেউ একজন সেটা নিয়ে ঠাট্টা করল। এখন এমনকি হাসার সময়ও মাঝে মাঝে আমার মনে হয় আশপাশের মানুষগুলো কি আমাকে নিয়ে হাসছে? তারা কি ভাবছে আমি দেখতে বোকার মতো লাগছে? তারা কি খেয়াল করছে আমি কীভাবে নড়াচড়া করছি, কীভাবে কথা বলছি, আমার গলার আওয়াজ কেমন শোনাচ্ছে?

আমি এমনভাবে কোনো কিছু উপভোগ করতে চাই যেখানে একসাথে বসে হিসাব করতে হয় না যে আমি নিয়ম মেনে আনন্দ করছি কি না!

এগুলো কোনো বিপদ এড়ানোর বা অন্যকে সম্মান করার পাঠ ছিল না। আমি তো জোরে হেসে বা লাফালাফি করে কারো ক্ষতি করছিলাম না। আমি আসলে শিখছিলাম যে আমার আনন্দ পাওয়ার অধিকারটাও প্রকাশ করার আগে যাচাই করে নেওয়া উচিত।

কেউ যখন আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করত, তখন আমার মনে যা আসত তা না বলে একজন “ভালো মেয়ে” যা বলা উচিত, বলতে হবে, এটাই জানতাম। কোনো কিছুতে আমার ভালো না লাগলেও আমাকে জোর করে সেটা চালিয়ে যেতে হবে। হেরে যাওয়া বা হাল ছেড়ে দেওয়াটা ছিল কেবল অপদার্থদের কাজ। সেই শিক্ষাগুলো শুধু ছোটবেলার ভদ্রতাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।

প্রথমবার কোনো ছেলে যখন আমার সাথে খারাপ আচরণ করল, তখন আমি ঠিক যেভাবে রিঅ্যাক্ট করা উচিত ছিল সেভাবে করিনি। আমি সদয় ছিলাম। আমি ভাব ভঙ্গি করলাম যেন সব ঠিক আছে। এমনকি মুখে এও বললাম যে—সব ঠিক আছে! কেউ যখন আমাকে এড়িয়ে চলত, তখন আমি উল্টো তাদের আরও কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতাম। আমি প্রমাণ করতে চাইতাম যে আমি খারাপ না, আমি কেয়ার করি, আমি ছেড়ে যাব না। বারবার আমাকে আঘাত করেছে এমন মানুষের কাছেই আমি নিজেকে সহজলভ্য করে তুলেছিলাম, কারণ আমার কাছে সম্পর্কের চেয়ে “সবাইকে খুশি রাখা” বা নির্ভরযোগ্য হওয়াটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আমি এমন চাকরি আঁকড়ে ধরে রেখেছিলাম যা আমি ঘৃণা করি। এমন একটা মানুষের সাথে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রেখেছিলাম যে বারবার কষ্ট দেওয়া সত্ত্বেও আমি তাকে ছাড়িনি। ক্ষতিকর বা এবিউসিভ সম্পর্কেও আমি পড়ে ছিলাম এই ভয়ে যে—কাউকে ভালোভাবে জানার পর যে মেয়েগুলো সরে যায়, আমি যেন তাদের দলের না হই। আমি অনুগত ও বিশ্বস্ত থাকতে চেয়েছি। এমন একজন মানুষ হতে চেয়েছি যে মানুষকে ছেড়ে দেয় না।

পেছনে ফিরে তাকালে নিজের ওপরই রাগ হয়, কেন আমি এতবার ওই সম্পর্কগুলোতে টিকে ছিলাম!

কিন্তু নিজেদের রক্ষা করতে না পারার অর্থ এই নয় যে অন্য কারো খারাপ আচরণের দায় আমার! “সব ঠিক আছে” বলার মানে এই না যে আসলেই সব ঠিক ছিল। আমাকে কষ্ট দেওয়ার দায় একমাত্র সেই মানুষগুলোরই ছিল যারা আমাকে আঘাত করেছিল। আমার সবচেয়ে বেশি আফসোস হয় এই ভেবে যে, আমার ভেতরের যে অংশটা আমাকে ওই পরিস্থিতি থেকে বের করে আনতে চাইত, তাকেই আমি পুরোপুরি অবিশ্বাস করতে শিখে গিয়েছিলাম। আমি নাছোড়বান্দা হয়ে টিকে থাকা শিখেছিলাম ঠিকই, কিন্তু সেই টিকে থাকাটা আমার নিজের জন্য কতটা চরম মূল্য বয়ে আনছে, তা বোঝার অনুমতি আমার ছিল না।

বাবা-মায়ের প্রত্যাশা পূরণের ওপর যখন সন্তানের প্রতি ভালোবাসা ও স্বীকৃতি নির্ভর করে, তখন তাকে পেরেন্টাল কন্ডিশনাল রিগার্ড বলা হয়। এই ধরনের মনোভাবের সঙ্গে বাচ্চাদের অতিরিক্ত মানসিক চাপ, প্রত্যাশা পূরণের ওপর আত্মসম্মানবোধের নির্ভরতা, বিষণ্ণতার লক্ষণ এবং সম্পর্কের দূরত্বের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। এগুলো পারস্পরিক সম্পর্কের যোগসূত্র মাত্র; কারো ব্যক্তিগত জীবনের কষ্টের কারণ প্রমাণ করে না। তবুও, গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য আগে শর্ত পূরণ করার এই অনুভূতিটা আমার খুব চেনা।

আমি একজন ভালো মানুষ হতে চেয়েছি। আর সেই যাত্রাপথেই আমি শিখেছি যে ভালো মানুষ হওয়ার অর্থ হলো—যা কিছু আমাকে কষ্ট দেয়, তার সামনে নিজেকে সবসময় বিলিয়ে দেওয়া।

২০০৬ সালের দিকে, আমার ফিজিক্স শিক্ষক আমাকে এমন একটা প্রশ্ন করেছিলেন যা আমার মাথাতেই ঢুকেনি। আমি তার দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিলাম, আর তিনি তখন পুরো ক্লাসের সামনে আমাকে “রিটার্ড” বলে গালি দিলেন। আমি চুপ করে বসে রইলাম। আমি বুঝতেই পারছিলাম না এটার বিপরীতে আমার ঠিক কী রিঅ্যাক্ট করা উচিত। আমি শুধু জানতাম যে এটা আমাকে খুব আঘাত দিয়েছে। কিন্তু সেই আঘাত পাওয়ার পর আমার কী করা উচিত ছিল, তা জানতাম না।

এমন আরও অনেক সময় গেছে যখন আমার মা সহ অন্য মানুষেরা আমার মুখের ওপর আমাকে মিথ্যাবাদী বলেছে। আমি তাদের কথা শুনেছি। বুঝেছি। মনে মনে নিজেকে অভিশাপ দিয়েছি। কিন্তু আমি প্রতিবাদ করিনি, কারণ সরাসরি আমাকে কোনো প্রশ্ন করা হয়নি তাই জবাব দেইনি, এটাই শিখিয়েছিলেন তারা। এই ছোট বিষয়টা আমাকে এখনো খুব ভাবায়। আমাকে একটা দোষ দেওয়া হচ্ছিল, অথচ আমি শুধু অপেক্ষা করছিলাম প্রতিবাদ করার একটা “অনুমতি” পাওয়ার জন্য।

আমার শিক্ষক তো অবশ্যই আমার বাবা-মা ছিলেন না। কিন্তু আমার ওই নিরবতার মাঝে আমি খুব পরিচিত একটা জিনিস দেখতে পাই: কেউ আমার সাথে খারাপ কিছু করার পর আমি যখন রিঅ্যাক্ট করতে যাব, তার আগেই আমি মনে মনে হিসাব কষতে শুরু করি যে এর একটা “গ্রহণযোগ্য” বা সুন্দর প্রতিক্রিয়া দেখতে কেমন হওয়া উচিত! এটাই আমাকে পার্ট ১-এর সেই প্রশ্নে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। বাইরে থেকে হয়তো আমাকে দেখে মনে হতো আমি খুব শান্ত ও গুছিয়ে আছি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি ছিলাম ক্ষতবিক্ষত ও অনিশ্চয়তায় ভরা। চুপ করে থাকার মানে এই নয় যে আমি সব মেনে নিয়েছি। এর মানে এই নয় যে আমি ঠিক আছি।

আমি পেছনের দিকে ফিরে সেই ছোট মেয়েটাকে এই বলে দোষ দিতে চাই না যে সে নিজের জন্য কথা বলতে পারেনি। ওই পরিস্থিতিগুলোতে সেখানে অনেক বড় বড় মানুষও উপস্থিত ছিল। তাদেরও তো কিছু দায়িত্ব ছিল!

আমি সেই চিরকালের কনস্ট্যান্ট সেলফ-মনিটরিং অভ্যাসের কথা বলতে পারি। হাসার আগে, কথা বলার আগে, কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগে বা কোনো জায়গা থেকে চলে আসার আগে আমি সবসময় নিজেকে প্রশ্ন করতে শিখেছিলাম—আমি কি ঠিক কাজটা করছি? আমি কি ঠিক অনুভূতিটা অনুভব করছি? আমি কি খুব বেশি দেখিয়ে ফেলছি, নাকি ভুলভাবে প্রকাশ করছি?

আমার মনে হয় এই জিনিসগুলো আমার অ্যানজাইটি বাড়িয়ে দিয়েছিল। এটা নিশ্চিতভাবেই নিজের ওপর ভরসা করাটাকে আমার জন্য অনেক কঠিন করে দিয়েছিল। তবে কোন ঘটনার সাথে কোনটার যোগসূত্র আছে, তা আলাদা করা দরকার। আমার শৈশবের এই ঘটনাগুলোকে আমি আমার জীবনের প্রতিটা সমস্যার নিখুঁত কারণ বানিয়ে নিতে পারি না, বা আমার গড়ে ওঠা প্রতিটা স্বভাবকে একটা সুনির্দিষ্ট মানসিক অবস্থার সাথে জুড়ে দিতে পারি না।

আমি কেবল এটুকু বলতে পারি যে এই অভিজ্ঞতাগুলো আমাকে আঘাত করেছে, মানুষের সাথে আমার যোগাযোগের ধরন বদলে দিয়েছে এবং এমন কিছু প্যাটার্ন তৈরি করেছে যা আমি আজও বোঝার চেষ্টা করছি। আমি কোনো মেডিকেল ডায়াগনোসিসের উৎস প্রমাণ করার চেষ্টা করছি না। আমি শুধু বলছি—আমার সাথে যে আচরণ করা হয়েছিল, তা আমার জন্য ক্ষতিকর ছিল।

এই তফাতটা আমাকে নিজের ভেতরের ক্ষতগুলোকে স্বীকার করতে সাহায্য করে, অথচ আমার ব্রেন কীভাবে কাজ করে সেই জটিলতার সব উত্তর আমার জানা আছে—এমন ভান করতে হয় না।

এই সিরিজের উদ্দেশ্য কেবল পেরেন্টিংয়ের বিভিন্ন পদ্ধতিকে খলনায়কের তকমা দেওয়া নয়। যখন কোনো অভিভাবক ভীষণ কড়া শাসন বা অথরিটেরিয়ান পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তখন এর পেছনে প্রায়ই একটা উদ্দেশ্য থাকে: তারা চান বাচ্চা যেন জীবনে সফল হয়, বিপদে না পড়ে, পড়াশোনায় ভালো করে এবং শৃঙ্খলা মেনে চলে।

আর সত্যি বলতে, এই পদ্ধতি কাজও করতে পারে। কড়া শাসনের ভয়ে বাচ্চারা হয়তো ঠিক সময়ে পড়া শেষ করে, ঘরের নিয়মের বাইরে যায় না, আর বাইরের দুনিয়ায় তাদের বেশ “শৃঙ্খলিত” বা ভালো আচরণের অধিকারী মনে হতে পারে।

কিন্তু প্রশ্নটা হলো—এই সাফল্য বা শৃঙ্খলার দাম কত দিতে হয়?

বাইরের নিয়ম মানাতে গিয়ে ভেতরের মানুষটাকে যদি প্রতিদিন একটু একটু করে পিষে ফেলা হয়, নিজের মতামত বা অনুভূতির কোনো দাম না থাকে, তবে সেই শৃঙ্খলার মূল্য অনেক বেশি হয়ে যায়।

আজকে যখন আমি নিজেই একজন অভিভাবক, তখন আমার সামনে প্রতিদিন এমন পরিস্থিতি আসে যেখানে আমার বাবা-মা কড়া শাসন বা হুমকির আশ্রয় নিতেন।

যখন আমার ছেলে কোনো নিয়ম মানতে চায় না বা জেদ ধরে, তখন আমার ভেতরের একটা পুরোনো ভূত মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে: ওকে এখনই কড়া হাতে দমাও, নইলে ও মাথায় উঠবে!

কিন্তু আমি থেমে যাই। আমি নিজেকে মনে করিয়ে দিই—আমি কি ওকে এমন একজন মানুষ বানাতে চাই যে শুধু ভয়ে আমার কথা শুনবে, নাকি এমন কেউ যে বুঝেশুনে একটা সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে?

আমি আমার ছেলেকে শেখাতে চাই যে নিয়মের একটা গুরুত্ব আছে, ঠিকই; কিন্তু তার মানে এই নয় যে তার নিজের কোনো অনুভূতি বা কথা বলার অধিকার নেই। সে ভুল করতে পারে, রাগ দেখাতে পারে, আর তার মানে এই নয় যে সে খারাপ হয়ে গেছে।

অতীতে যা হয়েছে তা আমি মুছে ফেলতে পারব না। কিন্তু আমার আজকের দিনগুলোকে আমি অন্যভাবে গড়তে পারি।

আমি যে জিনিসগুলো সচেতনভাবে বদলাতে চাই:

  • বাচ্চার কান্নায় বিরক্ত না হয়ে তার পেছনের কারণটা শোনার চেষ্টা করা।
  • ভীতি দেখিয়ে বা হুমকি দিয়ে কোনো কাজ না করিয়ে, তাকে নিজের মতো করে একটা সমাধানের অংশীদার করা।
  • নিখুঁত বা “ভালো” হওয়ার অন্ধ চাপে না রেখে, তাকে নিজের মতো করে বড় হওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া।

আর যে জিনিসগুলো আমি এখনো আমার ভেতর থেকে ঝেড়ে ফেলার লড়াই করছি:

  • একটুতেই নিজেকে দোষী ভাবার সেই পুরোনো স্বভাব।
  • নিজের প্রয়োজন বাদ দিয়ে অন্যকে খুশি করার সেই অতিরিক্ত তাগিদ।
  • না বলতে পারার ভয়।

পথটা সহজ নয়। ছোটবেলার শেকড়গুলো অনেক গভীরে থাকে। কিন্তু প্রতিদিন যখন আমি আমার ছেলের সাথে একটু অন্যভাবে, একটু নরম ও সজ্ঞাতভাবে কথা বলি, তখন মনে হয়—আমি শুধু তাকেই একটা ভালো শৈশব দিচ্ছি না, সাথে সাথে আমার ভেতরের সেই ছোট মেয়েটাকেও একটু একটু করে শান্ত করছি।