এগুলো আমাদের হয় না
On Autism, Denial, and the Violence We Call Discipline.

কেন যে ঘুমাতে যাওয়ার ঠিক আগে মাথার মধ্যে সব চিন্তা জটলা পাকায় আর লিখতে ইচ্ছে করে—কিন্তু পর্দার সামনে বসার সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিটি চিন্তা হঠাৎ গায়েব হয়ে যায়?
কখনোই চিন্তাগুলো ধরে রাখতে পারি না কেন, বুঝি না।
এটা অবশ্য আমার থেরাপিস্ট বলবে এডিএইচডি-র দোষ।
এডিএইচডি—অর্থাৎ বড়লোকের রোগ। প্রথম বিশ্বের রোগ। আমরা মধ্যবিত্তরা যেটাকে রোগ বলেই মানতে চাই না। এগুলো আমাদের হতেই পারে না। এগুলো হয় ঘাড়ত্যাড়ামি, না হলে ফেতরামি।
বাচ্চা বড় হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এখনো কথা বলে না? নিশ্চয়ই ঘাউড়া।
বড় ছেলে রেগে গেলে প্লেট ভাঙে? মাথা গরম।
এগুলো কখনোই বিকাশজনিত কোনো প্রতিবন্ধকতা কিংবা আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা হতে পারে না। কারণ এগুলো, ভাই, আমাদের হয় না।
এডিএইচডি হোক, অটিজম হোক কিংবা অন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা—নাম বদলায়, কিন্তু অস্বীকারটা বদলায় না।
নিজের পরিবারের কারও কোনো প্রতিবন্ধিতা থাকতে পারে—এই সম্ভাবনাটাই আমাদের কাছে অভিশাপের মতো মনে হয়। লোকে জানতে পারলে কী বলবে?
“আমার সন্তান অটিজম স্পেকট্রামে”—এটা স্বীকার করার চেয়ে, ভাই, স্বীকারই করব না। তাহলে কেউ জানবেও না। কোনো কথাও উঠবে না।
এর মধ্যে বাচ্চাটি যে তার প্রয়োজনীয় সাহায্য পাচ্ছে না, সেই সত্যটা পুরোপুরি চোখের আড়ালে চলে যায়। যেন বাচ্চাটিই সবার শেষে চিন্তা করার বিষয়—সবার আগে নয়।
আমাদের সমাজ বাচ্চাটির কী হচ্ছে, সেটা নিয়ে যতটা না মাথা ঘামায়, তার চেয়ে অনেক বেশি মাথা ঘামায় লোকে কী বলবে, সেটা নিয়ে।
এখন যদি বলি এটা অজ্ঞতা বা সচেতনতার অভাব—সেটাও পুরোপুরি ভুল নয়। আমাদের দেশে অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের কাছে এসব বিষয়ে জানার, বোঝার কিংবা কথা বলার মতো তথ্য, সহায়তা বা সুযোগই নেই।
আর যাঁদের সেই সুযোগ আছে?
তাঁরা চোখ বন্ধ করে এড়িয়ে যান।
কাউকে দূর থেকে দেখেও যদি মনে হয় তার কোনো প্রতিবন্ধকতা আছে, তাহলে উল্টো দিকে দৌড় দেন। কোনো ধরনের সম্পর্কই রাখতে চান না। যেন মানুষটির ভিন্নতাটা ছোঁয়াচে।
আর মানুষকেই-বা দোষ দিই কীভাবে? যাঁদের নিজের পরিবারে স্নায়ুবৈচিত্র্যসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী কেউ আছেন, তাঁরাও যে বিষয়টি বোঝার খুব চেষ্টা করেন, তা কিন্তু নয়।
মাইর, কিল, বকাঝকা দিয়ে যতটুকু সামলানো যায়, সামলান। আর না পারলে “পাগলা গারদ” তো আছেই।
যাঁরা এমনিতেই নিজেদের সামর্থ্যের চেয়ে বেশি রোগী সামলাচ্ছেন, তাঁদের ঘাড়ে আরেকজনকে চাপিয়ে দাও।
বাচ্চাটির কী দরকার, কীভাবে তার জীবনটা সহজ করা যাবে, কীভাবে তাকে এই পৃথিবীতে বাঁচার জন্য প্রস্তুত করা যাবে—এগুলো আমাদের চিন্তার বিষয় নয়।
আগে দেখি, লোকে কী বলে।
আমি অটিজম স্পেকট্রামে থাকা এক বাচ্চার মা।
আমার বাচ্চার এমন কিছু চোখে পড়লে, যার জন্য সাহায্য দরকার, আমাকে শুধু সেই সাহায্য খুঁজে পেতেই লড়াই করতে হয় না।
আমাকে লড়াই করতে হয় এমন একটি ব্যবস্থার সঙ্গে, যে ব্যবস্থা এখনো শিখছে—যাদের মস্তিষ্ক অন্যভাবে কাজ করে, তাদের সঙ্গে কীভাবে সহাবস্থান করতে হয়।
আমাকে লড়াই করতে হয় পরিবারের সঙ্গে—যারা মানতেই চায় না যে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
আমাকে লড়াই করতে হয় আমার নিজের ভেতরে গেঁথে দেওয়া বিশ্বাসগুলোর বিরুদ্ধে। যে বিশ্বাসগুলো আমাকে প্রতিনিয়ত বলে, আমি বাড়াবাড়ি করছি। বেশি আদর দিয়ে আমার বাচ্চাকে নষ্ট করে ফেলছি।
একজন মানুষ সারাদিন এমন একটি বাচ্চার যত্ন নেয়, যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, নিজে খেতে পারে না, নিজের প্রয়োজনের কথা জানাতে পারে না এবং নিজের অসহ্য লাগার কারণটি বোঝাতে না পেরে ক্রমাগত চিৎকার করে।
দিন শেষে সেই মানুষটির কি আর কোনো কিছুর সঙ্গে লড়াই করার শক্তি থাকে?
বিছানায় ঢলে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে যাওয়া ছাড়া তার কি আর কোনো উপায় থাকে?
থাকে না।
বহু বছর এমন গেছে, যখন বিছানা পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই আমি ঘুমে ঢলে পড়েছি। কোনো মিটিং শুরু হওয়ার ঠিক আগে ঘুমিয়ে পড়েছি। আমার সুন্দর শিশুটির ওপর মেজাজ হারিয়েছি—যে ইচ্ছে করে আমার জীবন কঠিন করছিল না।
ও শুধু জানত না কীভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। কীভাবে আমাকে বোঝাতে হয় যে চারপাশের শব্দ ওর সহ্যক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।
তবু আমরা থামি না।
যেটুকু শক্তি জোগাড় করতে পারি, সেটুকু নিয়েই আবার লড়াই করি।
আমরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সেই বিশ্বাসের বিরুদ্ধে লড়াই করি, যা আমাদের বলে, “আদর দিয়ে মা বাচ্চাটাকে নষ্ট করে ফেলেছে।”
আমরা নিজেদের পরিবারের সঙ্গে লড়াই করি।
আমরা এমন একটি ব্যবস্থার সঙ্গে লড়াই করি, যা কখনোই স্নায়ুবৈচিত্র্যসম্পন্ন মানুষদের কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।
আমরা লড়াই চালিয়ে যাই, যাতে একদিন আমাদের সন্তানেরা এই পৃথিবীতে নিজের মতো করে বাঁচতে পারে—“অস্বাভাবিক” শব্দটির মধ্যে আটকে না থেকে।
কোনো ভাষাতেই আমার কাছে এটা অর্থপূর্ণ মনে হয় না যে নিজের সন্তানকে খুব বেশি ভালোবাসা যায়।
ভালোবাসা কীভাবে খুব বেশি হয়?
নিজের সন্তানকে বুঝতে এবং সাহায্য করতে চাওয়া কীভাবে বাড়াবাড়ি হয়ে যায়?
আমি বুঝি না।
“বেশি কাঁদলে রেখে চলে যাবে। নিজে নিজেই ঠিক হয়ে যাবে।”
কোন পৃথিবীতে একজন মানুষের সঙ্গে এমন আচরণ করা যুক্তিসংগত?
একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ যদি কষ্টে কাঁদতে থাকে আর সবাই তাকে ফেলে রেখে চলে যায়—সে নিজে থেকে থামা পর্যন্ত—তাহলে সেই আচরণকে আমরা কী বলব?
একজন মুসলিম বা ইহুদি মানুষকে যদি জোর করে শূকরের মাংস খাওয়ানো হয়, অথবা একজন হিন্দু মানুষকে গরুর মাংস, তাহলে আমরা সেটাকে কী বলব?
সরাসরি নির্যাতন বলব না?
খাবার প্রত্যাখ্যানের কারণ আলাদা হতে পারে। কিন্তু নিজের শরীরের ওপর একজন মানুষের অধিকার থাকার প্রশ্নটি একই থেকে যায়।
তাহলে চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থা ছাড়া, কথা বলতে না-পারা একটি শিশুর মুখে জোর করে খাবার ঢুকিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য কেন?
যে শিশু বোঝাতে পারে না খাবারটির স্বাদ, গন্ধ বা গঠন তার কাছে কেমন লাগছে। যে জানাতে পারে না তার শরীর কিসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।
এই আচরণ এতটা স্বাভাবিক হয়ে গেল কীভাবে যে এটা করতে অস্বীকার করলেই একজন মা-বাবাকে অদ্ভুত—এমনকি খারাপ—মনে করা হয়?
বিশেষ করে একটি স্নায়ুবৈচিত্র্যসম্পন্ন শিশুর ক্ষেত্রে, যে হয়তো কোনো খাবারের গঠন, কোনো শব্দ, গন্ধ, আলো, স্পর্শ কিংবা মানুষের উপস্থিতি কেন সহ্য করতে পারছে না, সেটাই ভাষায় বোঝাতে পারে না।
আমাদের সমাজ তার সেই সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতাকে একটি সুবিধাজনক বাক্যের নিচে চাপা দিয়ে দেয়:
“শাসন দরকার।”
শিশুর সীমারেখা, শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা অবশ্যই দরকার। কিন্তু ইন্দ্রিয়গত যন্ত্রণা অবাধ্যতা নয়। আর শাস্তি কখনো সহায়তার বিকল্প হতে পারে না।
আর কত দিন আমরা স্নায়ুবৈচিত্র্যকে উপেক্ষা, এড়িয়ে এবং অস্বীকার করে যাব?
আর কত দিন পর আমরা নিজেদের সন্তানের প্রয়োজনকে সবার আগে রাখব?
“লোকে কী বলবে?”—এই প্রশ্নটির বাইরে আমরা ভাবতে পারি না কেন?
আমরা কবে থামব এবং শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞাসা করব:
আমার সন্তানের কী দরকার?
আমি কীভাবে তাকে সাহায্য করতে পারি?
সে যেভাবে শিখতে পারে, ঠিক সেভাবে আমি তাকে প্রয়োজনীয় দক্ষতাগুলো শেখাব কীভাবে?
আমি কীভাবে তার জীবনটা একটু সহজ করতে পারি?